শুক্রবার, ১৪ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্বপ্ন ও আত্মপ্রত্যয়-এর উপাখ্যান ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’!

 

সিনহা মনসুর


আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’তে প্রধান মনুষ্য চরিত্র মাত্র দু’টি! দু’টিই পুরুষ।উপন্যাসে কোন প্রধান নারী চরিত্র নেই।তার জন্যে অবশ্য পাঠকের কোন ক্ষেদ নেই। নেই লেখকেরও! এই দুই মনুষ্য চরিত্রের বাইরে রয়েছে আরেকটি চরিত্র। আর সেটি হচ্ছে মহান ও সুবিশাল ‘সমুদ্র’! গল্পের নায়ক বুড়ো সান্তিয়াগোর মতে ‘এই সমুদ্র সম্ভবত সকল প্রাণীর শিক্ষক’। সান্তিয়াগো তার অনুগত ছাত্র!

সান্তিয়াগো সমুদ্রকে ভাবে দয়ালু।যেমন স্পেনীয়রা যুগ যুগ ধরে ভেবে এসেছে! যারা সমুদ্রকে ভালবাসে তারাই আবার সমুদ্রকে নিয়ে গালমন্দ করে।দামাল জেলেরা যারা মোটর-বোট আর বয়া নিয়ে সমুদ্র দাপডে বেড়ায়, সমুদ্রে হাঙর ধরে আর বাজারে হাঙর মাছের তেল বেচে দু’পয়সা কামায়-ওদের ধারণা সমুদ্রটা পুরুষ! ওরা সমুদ্রকে বলে প্রতিদ্বন্দ্বী! নয়তো শত্রু! কিন্তু বুড়ো সান্তিয়াগো সমুদ্রকে বলে ‘নারী’! কারন সে সমুদ্র থেকে পেয়েছে সাহায্য ও সাহচর্য!পেয়েছে অবারিত সোহাগ!

সমুদ্র আসলে কি! কি তার চরিত্র!
সে নারী না পুরুষ?
কে জানে!

আমাদের এই বুড়ো একসময়ে নবীন ছিল।তখনো জেলে হয়ে উঠেনি।জেলে হয়ে ওঠার আগে ও একটা কচ্ছপ ধরার বোটে কাজ করতো।ওখন ওর নিজের কাছে মনে হতো ওর হৃদয় আর পদযুগলগুলো যেন কচ্ছপের! সে কচ্ছপের সাদা সাদা ডিম খেয়েছে। গায়ে জোর হবে সেই আশায়। সে রোজ এক গেলাস হাঙরের তেলও খেত। বুকে ঠাণ্ডা ও সর্দি বসার হাত থেকে এই তেল বাঁচায়, চোখ ভাল করে বলে।এভাবেই সমুদ্রের জন্য নিজেকে তিল তিল করে তৈরি করেছিলো ওই বুড়ো!

সান্তিয়াগোর স্ত্রী মারা গিয়েছেন বহু আগে।তিনি নিঃসন্তান।বয়সের ভারে অনেকটা বাঁকা হয়ে এসেছে তার শরীর! অসংখ্য বলিরেখা নেমে গেছে ঘাড়ের দু’পাশে। ওর গালের মানচিত্রে রোদেপোডা বাদামী ফুসকুড়ি।হাত দুটো ক্ষতবিক্ষত! বড়শির দড়িতে বারংবার ভারি মাছ টেনে তুলবার ফসল! তবে ওই ক্ষতগুলোর কোনটাই গতকালের নয়, ওগুলো পুরনো, ওগুলো প্রাচীন! ওর সবকিছুতেই কেমন যেন প্রাচীনত্বের ছোঁয়া। শুধু একটি জিনিস ছাড়া। আর সেটি হচ্ছে বুড়োর দু’টি চোখ! যে চোখে কোন বার্ধক্য নেই, নেই কোন ক্লান্তি । সেখানে সাগরের নীল অপরাজেয় জ্বল জ্বল করছে! ওই চোখেই ওর স্বপ্ন ও ভালবাসা!

এই উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র হল ম্যানোলিন! ম্যানোলিন একজন বালক, যে আগে সান্তিয়াগোর নৌকায় কাজ করত । এই বালকটি সান্তিয়াগোর ভক্ত!এক সময় সে সান্তিয়াগোর সেবা-যত্ন করত, তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করে দিত, খবরের কাগজ এনে দিত এবং সান্তিয়াগোর সাথে মনের সুখে আমেরিকান বাস্কেটবল খেলার গল্প করতো পুরনো পত্রিকা থেকে!

‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’ উপনাস্যের কাহিনীটা শুরু হচ্ছে এভাবে:
বুড় সান্তিয়াগো ডিঙিতে চেপে গালফ স্ট্রীমে একাকী মাছ ধরে বেড়ায়। আজ চুরাশি দিন হল বুডো একটি মাছও পায়নি! প্রথম চল্লিশ দিন ম্যানোলিন ছিল ওর সঙ্গে। কিন্তু চল্লিশ দিন পরেও যখন কোন মাছ উঠলো না, ম্যানোলিনের বাবা-মা ওকে বলল, বুড়ো সান্তিয়াগো চরম অপয়া হয়ে গেছে। ওর সাথে কাজ না করাই সমীচীন ।বাবার নির্দেশে ম্যানোলিনের চলে গেল অন্য নৌকায়। নূতন বোটে প্রথম সপ্তাহেই বড় বড় তিনটে মাছ ধরেছে ওরা।

রোজ রোজ বুড়োকে শূণ্য ডিঙি নিয়ে ফিরতে দেখে খারাপ হয়ে যায় ছেলেটার মন। বুড়ো এলেই ম্যানোলিনের দৌড়ে চলে যায় ওই ডিঙিতে। বুড়োকে সাহায্য করতে।কখনো মাছধরা দড়ি, কখনো কোঁচের বোঝা, কখনো হারপুন, কখনোবা মাস্তুলে গোটান পাল বয়ে আনতে সাহায্য করে। পালে ময়দার বস্তার অসংখ্য তালি! গোটান অবস্থায় দেখে মনে হয় যেন পরাজয়ের ধ্বজা!

বেঁচে থাকার তাগিদে মুনাফা-নির্ভর সমাজে আমরা তো পন্য! মানুষ নামের পন্য! হাত বদল হয়ে যায়, মালিক বদল হয়ে যায় এই পন্যের! কারনে-অকারনে!কি করে একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার একটি চিত্রকল্পও স্পষ্ট হয় আমাদের কাছে। একই সঙ্গে বুড়োর প্রতি ছেলেটির মায়া ও মমতা প্রমাণ করে যে মুনাফা আর লোভের অন্তহীনতা নিঃশেষ করে দিতে পারে না মানবীয় সম্পর্ক। সেটি অবশিষ্ট থাকে বলেই মানুষ স্বপ্ন দেখে! সুন্দর সময়ের স্বপ্ন। যে সময়ে মুনাফা নয়, পুঁজির অনবরত শাসন নয়, মানবিক প্রেমই নির্মাণ করে জীবনের আসল চরিত্র! আসল ঐশ্বর্য! জীবন নামের উত্তাল সমুদ্রে আবক্ষ নিমজ্জিত থেকেও হার মানে নি সান্তিয়াগো! সে স্বপ্ন দেখেছে! জীবনের বিবর্ন সমুদ্র সৈকতে কেশর ফোলানো সিংহের স্বপ্ন!এইজন্যেই, হেমিংওয়ে ক্লাসিক! ক্লাসিক তার সৃসটি ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’!

এই উপন্যাসের সিংহভাগ জুড়ে সমুদ্র। পৃথিবীর তিনভাগ জল আর এক ভাগ স্থলের মতো! সমুদ্র কখনো এসেছে প্রকৃতভাবে। কখনোবা রুপকারথে! সমুদ্রের পানি কেটে কেটে বেরিয়ে যাওয়া উডুক্কু মাছ। সমুদ্রের তলা থেকে বেরিয়ে আসা নানা জাতের হাঙর। হাঙরের খেলাধূলা, শারিরীক কসরত! সব মিলিয়ে এক ঘোর তৈরি করেছেন হেমিংওয়ে! এই ঘোর জীবন-সমুদ্রের! এই ঘোর জীবনের!

অবশেষে গভীর সমুদ্রে একটি মাছের দেখা পায় বুড়ো! মাছটি সহজে ধরা দেয়না! তখন বুড়ো হুংকার ছেড়ে বলে:
‘যত বড়ই হোক, ওটাকে আমি মারবই। ওর বিরাটত্ব আর বড়াই আমি শেষ করবই।ওকে আমি দেখাবো মানুষ কি করতে পারে আর মানুষের লেগে থাকার শক্তি কত ভয়ংকর’!

মাছটিকে ও জালে আটকিয়ে ফেলে। কিন্তু টেনে বোটে তুলতে পারে না। বিশাল ওই মাছ। তাই সিদ্ধান্ত নেন, জালে বন্দী মাছটাকে বোটের সাথে বেধে তীরে নিয়ে আসার।শুরু হয় তীরের দিকে বুড়োর যাত্রা। এই যাত্রায় দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘঠে হাঙরের! মধ্যসত্বভোগী হাঙর! হাঙর মাছটির গায়ে কামড় দিয়ে অনেকখানি খুবলে নেয়।এরপর বুড়ো আর মাছটির দিকে তাকায় না।তার লক্ষ্য তীরের দিকে।

এক সময় তীরে পৌঁছায় বুড়ো।সাগরও শান্ত হয়ে আসে।কিন্তু ততক্ষনে মাছটিকে খুলবে খুলবে খেতে ফেলেছে মধ্যসত্বভোগী হাঙরের দল! পড়ে আছে শুধু বিশাল এক কংকাল!

আপনি, অামি,আমরা- আমাদের সমাজ আমাদের সংসার-আমরা সবাই কিন্তু কংকাল!

 

লেখক: সিনহা মনসুর 

নিউইয়র্ক প্রবাসী।

Comments are closed.

More News Of This Category