শুক্রবার, ১৪ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শুক্রবারের গল্প

মোরশেদ আলম হীরা 


ইংরেজিতে একটা কথা আছে — Face is the index of mind — অর্থাৎ মুখ দেখেই একজন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

একটা দেশের ফেস সে দেশের এয়ারপোর্ট। ঢাকা এয়ারপোর্ট বাংলাদেশের ফেস। বিদেশিরা এই এয়ারপোর্টে পা রেখে কি দেখতে পান?

তারা দেখেন যে এয়ারপোর্টে ওয়াই ফাই নেই! শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ঠিক মত কাজ করছে না! ফ্লোর টাইলস জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে!

মন্ত্রীরা অনবরত বলে যাচ্ছেন বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বিস্ময়! এই বিস্ময়কর বাংলাদেশই কী তারা পৃথিবীর মানুষকে দেখাতে চাচ্ছেন?

একটা দেশের আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে ওয়াই ফাই কানেকশন পাওয়া যায় না এটা বর্তমান দুনিয়াতে চিন্তা করা যায়! কী এক আজ আজব দেশে বসবাস আমাদের!

তিন সপ্তাহ আগে আমার এক নিকট আত্মীয় ঢাকায় সাত দিন ছুটি কাটিয়ে আমেরিকা ফিরে গিয়ে লিখলো তোমাদের সবাইকে এয়ারপোর্টে এসে ম্যাসেন্জারে বিদায় জানাব ভেবেছিলাম কিন্তু ওয়াই ফাই কানেকশন না পাওয়ায় সেটা সম্ভব হয় নাই!

গত শুক্রবার আমার ছেলেকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। এক ঘন্টা ইমিগ্রেশনে থাকা অবস্থায় ছেলে ওয়াই ফাই কানেকশন না পাওয়ায় ফোনে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। এমন অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আমার ছেলের মতন লাখ লাখ মানুষেরও হচ্ছে প্রতিদিন।

বিমান মন্ত্রী, সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা এদের কাজটা কী? ওয়াই ফাই ব্যবস্থা লাগানো আছে কিন্তু কানেকশন পাওয়া যায় না। এটা কে দেখবে?

এখন তো আমাদের দেশের বিচারকরা জাতীয় শ্লোগানও ঠিক করে দিচ্ছেন। তাই আমার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা ব্যারিস্টার ও এডভোকেটদের প্রতি বিনীত অনুরোধ করবো আপনারা হাইকোর্টে একটা রিট করুন। হয়তো কোন মাননীয় বিচারক অনতিবিলম্বে এয়ারপোর্টে ওয়াই ফাই ব্যবস্থা চালুর জন্য সিভিল এভিয়েশন কে নির্দেশ দিতে পারেন!

যাক সে কথা, বিপিএল এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতীয় শিল্পী সালমান খান ও আরো অনেকেই এসেছিল। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের একজন কর্মকর্তা ওদের দাওয়াত দিতে গেলে কী কথা হয় তা নাকি ফাঁস হয়েছে! দুই পক্ষের কথাবার্তা নিচের মত ছিল বলে বাজারে চালু আছে!

বোর্ড কর্মকর্তা :- সালমান ভাই আপনি, কার্টিনা, সনু নিগম সহ অন্য আরো কিছু শিল্পী আমাদের বিপিএল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসতে হবে।

সালমান :- ভাই আমি প্রফেশনাল। টাকা দিলেই যাব তবে এটা বাংলাদেশের বিপিএল অনুষ্ঠান তাই আপনাদের দেশের শিল্পী দিয়ে এটা করলে কী ভালো হতনা?

কর্মকর্তা : – সালমান আপনি আমাদের দেশের শিল্পীদের কথা কইয়েন না! এগুলো সব ফকির। কিছুদিন পর পর এক একজন আইসা দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ধর্না দেয় চিকিৎসার টাকার জন্য!

সালমান :- দেখুন আমরা তো শুধু হিন্দি গান গাইবো। কিন্তু আপনাদের বাঙালি কালচার হল বাংলা গান, দেশীয় নাচ। সরকারি অনুষ্ঠানে তো দেশের সংস্কৃতি প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন!

কর্মকর্তা :- সালমান ভাই আপনি কী যে বলেন। আমাদের কালচার হচ্ছে এগ্রিকালচার, বাংলা নিয়ে আমরা শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতামাতি করি।

সালমান :- তাই নাকি আপনাদের কালচার এগ্রিকালচার এটা তো জানতাম না!

কর্মকর্তা :- এটাই সত্যি তাইতো আপনার কাছে এসেছি। এইসব ক্ষেত মার্কা বাংলা গান বাংলার জনগন পছন্দ করে না! হিন্দি গান না শুনলে তাদের জোস আসেনা! আমাদেরও জোস আসে না!

কী আর করা সালমান খানকে আসতে হল তার দলবল নিয়ে। এবং স্মরণকালের নিকৃষ্টতম অনুষ্ঠান করে আমাদেরকে ধন্য করলেন তারা! অনুষ্ঠান শেষে দুই উপস্থাপকের সাথে কী কথা হল সালমান খানের?

পুরুষ উপস্থাপক:- সালমান আপনি এদেশে এসে আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। সারাদেশের মানুষ টেলিভিশনে আপনাদের দেখে মুগ্ধ হয়ে আছে। তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

সালমান :- জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

মহিলা উপস্থাপক:- সালমান আপনাকে কিন্তু আমাদের দেশে বছরে অন্তত দুই বার আসতে হবে!

সালমান :- আপনারা ডাকলে নিশ্চয়ই আবার আসবো।

তবে মঞ্চ ত্যাগ করার সময় সালমান মহিলা উপস্থাপককে আস্তে আস্তে বললেন, আপনি যে আমাকে বছরে দুবার আসতে বললেন এতে আপনাদের অনেক টাকা খরচ হবে কিন্ত! আপনি জানেন আমি একদিনে কত নেই?

কত আপনার পারিশ্রমিক?

দেখুন আমি ‘বিগ বসের’ প্রতি এপিসোডে ৫ কোটি টাকা নেই। আর দেশের বাইরে গেলে একদিনে দশ কোটি। এছাড়া অন্যান্য শিল্পীদের খরচ, যাতায়াত ও হোটেল ভাড়া তো আছেই!

হে হে হে… আপনি টাকার কথা চিন্তা করবেন না! আপনাদের পদধুলি পাব এটাই বড় কথা! আপনারা আসলেই আমরা ধন্য হয়ে যাব!

কী বলেন টাকার কথা চিন্তা করব না! আমি অনেক স্ট্রাগল করে আজ সালমান খান হয়েছি

আরে টাকা তো দিবে গৌরী সেন! এগুলো আপনার দেখার কথা না।

কে এই গৌরী সেন?

এই গৌরী সেন আমাদের জনগন। তাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়েই সব হবে। আমরা এখন ধনী দেশ!

তবুও চিন্তা করুন। এমন একটি অনুষ্ঠান করার জন্য কিন্তু অনেক টাকা খরচ হয়!

আপনাকে নিয়ে এমন একটা অনুষ্ঠান করতে খুব বেশি হলে ৩০/৪০ কোটি টাকা খরচ হবে! জেনে রাখুন, বাংলাদেশের জন্য এখন ৪/৫ হাজার কোটি টাকা কোন টাকাই নয়! এটা আমার কথা নয়, আমাদের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীর কথা।

শোনা যায় মহিলা উপস্থাপকের এই কথা শুনে সালমান খান নাকি এক ঘন্টা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়েছিল!!

যাক অনেকক্ষণ বকবক করলাম। কিছুদিন লেখার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আজ লিখলাম।
এবার নিজের কথা বলি…..

ছেলে দুবছর পর অষ্ট্রেলিয়া থেকে দেশে এসেছে তাই ভেবেছিলাম মাসখানেক ফেসবুক থেকে ছুটি নিব। ছেলের সাথে পুরোটা সময় কাটাবো। কোন লেখালেখি করবনা। এইজন্যই গত শুক্রবারে লিখিনি।

কিন্তু ফেসবুক যেন এক মায়ার জগত। এখান থেকে যেতে চাইলেও বোধহয় সহজে বিদায় নেয়া যায় না!

বহুদিন পর গত শুক্রবারে কোন লেখা লিখিনি বলে সারাদিন ম্যাসেজ ও কমেন্টে অনেকেই জানতে চান এখনো লেখা পোষ্ট করিনি কেন। জানতে চেয়েছেন আমি অসুস্থ কিনা!

এদের মধ্যে অল্প কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ মানুষের সাথেই কোনদিন সামনাসামনি দেখাও হয় নাই! নেই রক্তের কোন সম্পর্ক। অথচ আপনজনের মত এরা উদ্ভিন্ন হয়ে শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। এ কোন মায়া তা বুঝতে পারি না!

এটাই বোধহয় ফেসবুকের সবচেয়ে বড় সাফল্য যে লাইক কমেন্টের বন্ধুত্বকে তারা মায়ার বন্ধনে বাঁধতে পেরেছেন।

কবির ভাষায়, কী মায়া লাগাইলো মোরে…

লেখক :মোরশেদ আলম হীরা 

Comments are closed.

More News Of This Category