বৃহস্পতিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হাজীগঞ্জ ভূমি অফিসের কর্মচারী ফরিদগঞ্জের ইব্রাহিম খলিল কারাগারে  

 

বিশেষ প্রতিনিধি,চাঁদপুর 


সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ভাড়াটে বাহিনী দিয়ে সৎ ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের উপর হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে হাজীগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী ইব্রাহীম খলিল বাবুর বিরুদ্ধে।একই মামলায় জামিন নিতে গেলে আদালতের নির্দেশে জেল হাজতে পাঠানো  হয়েছে ইব্রাহিম খলিল বাবুকে। হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রতিপক্ষ সেলিম খানের সন্তানদের পক্ষে ইব্রাহিম খলিল বাবুর বিরুদ্ধে এলাকায় মানববন্ধন করেছে এলাকার লোকজন।

অভিযোগ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে,ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি (পূর্ব) ইউনিয়নের নারিকেলতলা নোয়াবাড়ির সেলিম খান (৬০) এর সঙ্গে ইব্রাহিম খলিল বাবুর জমিজমা সংক্রান্ত  বিরোধ চলে আসছিলো। এর জের ধরে উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিবাদ ও মামলা- হামলার ঘটনা ঘটে।ওই বিরোধ মিমাংসার জন্য গত ১১ জুলাই সোমবার সকালে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান,মেম্বার ও গণ্যমান্য শালিসীগণ ইব্রাহিম খলিলের ওই বাড়িতে যান। শালিসীগণ দু’পক্ষের কথা শুনেন ও দলিলপত্র পর্যালোচনা করেন।দু’পক্ষের চলমান বিরোধের স্থায়ী মিমাংসার জন্য চেয়ারম্যান একটি প্রস্তাব দেন।ওই প্রস্তাব ইব্রাহিম খলিল প্রত্যাখ্যান করে শালিসীদের অপমান করে তার ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এতে চেয়ারম্যান ও শালিসীগণ সেখান থেকে চলে আসেন। শালিসীগণ চলে যাওয়ার পর দু’পক্ষের মধ্যে বাকবিতন্ডা চলতে থাকে। এরই সূত্রধরে বেলা তিন ঘটিকা নাগাদ ইব্রাহিম খলিল ও তার ছেলে জয়ের নেতৃত্বে বাইরে থেকে একদল কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা রড, লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্রসস্ত্র হাতে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে।পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে সেলিম খানের ছেলে রহমান উল্লাহ  ৯৯৯-এ কল দিলে ফরিদগঞ্জ থানাকে বিষয়টি অবগত করে।পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার প্রায় ১০ মিনিট আগেই ইব্রাহিম খলিলের নেতৃত্বে একদল যুবক রহমান উল্লাহর পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা করে। এতে রহমান উল্লাহ ও তার ছোট ভাই মোঃ সোহাগ গুরুতর আহত হন। পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করেন।


নেপথ্যে দুই সহোদরের সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ 


এরই ধারাবাহিকতায় ইব্রাহিম খলিল বাবুকে ‘টাকার কুমির‘ ও তার ছেলে জয়কে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে এলাকাবাসী স্থানীয় গল্লাক ওয়াপদা বাজার এলাকায় মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে।মানববন্ধনকারীরা বলেন, অভিযুক্তরা সোহাগকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দ্বারা আঘাত করেছে।গুন্ডা বাহিনী ভাড়া করে ওই বাড়ি ও এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তারা, দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে ফাঁসী ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন।চাঁদপুর সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মোঃ সোহাগের বাম হাতের বাহু গভীরভাবে কেটে গেছে।



এ ঘটনায় সোহাগের ভাই রহমান উল্লাহ বাদী হয়ে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন(নং ১৪/২৫০, তারিখ: ১২-০৭-২০২২ খ্রিঃ) ওই মামলায়, বিজ্ঞ বিচারকের নির্দেশে বৃহস্পতিবার জামিন চাইতে গেলে ইব্রাহীম খলিল বাবুকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

অপরদিকে  হাজীগঞ্জ ভূমি অফিসের নাজির ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে বিগত ১ মার্চ বিজ্ঞ আদালতের আদেশে ২ মার্চ ফরিদগঞ্জ থানায় এ  সংক্রান্ত একটি মামলা রুজু করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইব্রাহিম খলিল ঐ মামলায় জামিনে এসে অফিস করছেন।

অনুসন্ধানকালে জানা গেছে,১০ই নভেম্বর ২০২১ তারিখে দুই সহোদরের মধ্যে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদ সৃষ্টি হয়।এতে সেলিম খান ও তার পরিবার সদস্যরা মারধেের শিকার হয়ে ফরিদগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করতে যান।থানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে আনন্দবাজারের পাশে ইব্রাহিম খলিল বাবুর হুকুমে ও নেতৃত্বে সেলিম খানের পরিবার সদস্যদের ওপর হামলা করা হয়।হামলায় দুটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ভাংচুর ও চালককেও মারধর করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় সেলিম খানের স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৫৪), ছেলে রহমান উল্লা (৩২), পুত্রবধু তাসলিমা (২৮), আত্মীয় আবদুল কাদের (৩২)সহ অন্তত সাতজন আহত হন। তারা চাঁদপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।এ ঘটনায় সেলিম খান বাদী হয়ে চারজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পেনাল কোড ১৮৬০ এর ১৪৮, ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৫০৬(২), ১০৯ ধারায় ‘মোকাম বিজ্ঞ আমলী আদালত ফরিদগঞ্জ, ও সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-০১, চাঁদপুর’-এ একটি অভিযোগ (নং সি আর ১০৯/২২, ফরিদগঞ্জ) দায়ের করেন।বিষয়টি পর্যালোচনা করে অভিযোগটি ফরিদগঞ্জ থানায় এফ.আই.আর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অফিসার ইনচার্জকে বিজ্ঞ বিচারক আদেশ প্রদান করেন (স্মারক নং ৬১, তারিখ: ০১-০৩-২০২২ খ্রিঃ)। পরদিন ফরিদগঞ্জ থানায় নিয়মিত মামলা রুজু (নং ৫, তারিখ: ০২-০৩-২০২২ খ্রিঃ) করা হয়।

এর কিছুদিন পর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা তামাদি হয়ে গেছে ভেবে ইব্রাহিম খলিল বাবু বাড়িতে পুনরায় দ্বন্দ্বের সূচনা করেন। তিনি প্রায় দুমাস পূর্বে সেলিম খান ও পরিবার সদস্যদের চলাচলের পথে কয়েক হাজার ইট স্তুপ করেন।

ইটের স্তুপ


চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে সেলিম খান নানানজনের কাছে ধর্ণা দেন। সবাই আশ্বাস প্রদান করলেও রহস্যজনক কারণে সে ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। অবশেষে বিচারের আশায় সেলিম খান ১লা মার্চ বিজ্ঞ আদালতের দ্বারস্থ হন। এদিকে, আদালতে দায়েরকৃত অপর অভিযুক্তরা হলেন সেকান্তর আলীর ছেলে দুলাল মিয়া, ইব্রাহিম খলিল বাবুর ছেলে ইসমাইল হোসেন জয়, স্থানীয় সাইসাঙ্গা গ্রামের মোঃ হারুন এর ছেলে আলোচিত ধর্ষণে অভিযুক্ত সিমুল (২১)সহ অজ্ঞাত ৪/৫ জন। অভিযোগ পর্যালোচনা করে বিজ্ঞ বিচারক শুধু মাত্র ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে ফরিদগঞ্জ থানায় এফ.আই.আর. দায়ের ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে আদেশ দেন।

এ ব্যপারে তৎকালীন সময়ে ক্রাইম রিপোর্টের অনুসন্ধানী টিমের সাথে  মুঠোফোন কথা হয় অভিযুক্ত ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে।ইব্রাহিম খলিল বলেন,আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।আমার পিতা মোহাম্মদ আলীর আমিই একমাত্র সন্তান।আমার মাতা হনুফা বেগমকে যখন আমার পিতা বিয়ে করেন তখন আমার মায়ের আগের সংসারের (মায়ের আগের স্বামী আঃ আজিজ)দুই ছেলে সেলিম খান রহিম খান ও দুই মেয়ে মঞ্জুমা খাতুন ও জাহানারা ছিলেন।আমার মা হনুফা বেগম তাঁর পিতার ওয়ারিশসূত্রে মোট ৫২ শতাংশ ভুমির মালিক হন।ওই সম্পত্তি থেকে আমার মা ২১শতাংশ সম্পত্তি বিক্রি করেন। বাকি ২৩ শতাংশ ভূমি থেকে আমার মা হনুফা তাঁর আগের সংসারের দুই কন্যা জাহানারা ও মঞ্জুমা খাতুনকে ৮শতাংশ জমি ১৯১ নং দলিলে হেবা করে দেন। বাদ বক্রি ১৫ শতাংশ জমি আগের স্বামী এবং দুই ছেলেকে হেবা করে দেন।পরবর্তীতে জাহানারা ও মঞ্জুমা তাদের ৮শতাংশ ভুমি আমার বাবা মোহাম্মদ আলীর কাছে বিক্রি করেন।আমার পিতার মৃত্যুর পর এককভাবে আমি ইব্রাহিম খলিল সে সম্পত্তির মালিক হই।ঐ সম্পত্তি দখল করতে গেলেই ওরা আমার ও আমার পরিবারের উপর হামলা করে।এরই প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট কোর্ট চাঁদপুর এ ১৪৫ ধারায় মামলা দায়ের করি যার নং ১১৩/২২।প্রতিপক্ষ যখন বুঝতে পারে এই সম্পত্তি কখনো ওরা পাবে না তখনই আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা শুরু করে। বোনের কাছ থেকে আমার খরিদকৃত সম্পত্তিতে ইট রেখেছি।ওই জায়গা ইজমালি, তার জন্য বন্টননামা দলিল প্রয়োজন হবে, তা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম খলিল বলেন, হ্যাঁ, হয়েছে। এ বিষয়ে সেলিম খান বলেন, তিনি সত্য বলেননি। একই দাগে দালিলিকভাবে আমিও মালিক।

অনুসন্ধানে ইব্রাহিম খলিলের মায়ের বিক্রি করা ২১ শতাংশ ভূমি বিক্রির কোন হদিস না পাওয়া গেলেও অন্যের সাথে বদল করার তথ্য উঠে আসে।

অপরদিকে ইব্রাহিম খলিলের সহধর্মিণী বলেন,ওরা আমাদের ঘরে হামলা করে আমাদের সিসিটিভি খুলে নিয়ে গেছে।ওদের হামলা করার রেকর্ড আমাদের কাছে আছে।

এ ব্যাপারে গুপ্টি পূর্ব ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান পাটওয়ারী জানান, তাদের অনেক দিনের বিরোধের মিমাংসা করতে গত সোমবার ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। উভয়পক্ষের কথা শুনেছি দলিল পর্যালোচনা করে দেখেছি। এরপর, স্থায়ী মিমাংসার জন্য প্রস্তাব দিলে ইব্রাহীম খলিল প্রত্যাখ্যান করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার ঘর থেকে এক প্রকার অপমান করে বের করে দিয়েছেন। বিকালে আমার প্রজেক্টে যাই। তখন লক্ষ্য করি, বাইরে থেকে আসা অন্তত ৭০/৮০ জন যুবক ওই বাড়ির ভেতর ও আশেপাশে হট্টগোল করছে। আমি এলাকার কয়েকজনকে ফোনে ঘটনাটি জানিয়েছি।কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাকচিৎকার শুনে জেনেছি ইব্রাহীম খলিল তার ছেলে জয়ের নেতৃত্বে আসা কিশোর গ্যাং এর ছেলেরা সোহাগ ও তার পরিবার সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা করেছে।তিনি বলেন, এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে এদের দৃষ্টান্তমূলক  বিচার হওয়া প্রয়োজন।

Comments are closed.

More News Of This Category